ছেড়া তার ও জ্বলে যাওয়া রোগে আক্রান্ত পল্লী বিদ্যুৎ ! অতিষ্ঠ অভয়নগরের মানুষ
প্রনয় দাস, অভয়নগর উপজেলা প্রতিনিধি //দেশের বৃহত্তর শিল্প-বাণিজ্য ও বন্দর নগর যশোরের নওয়াপাড়াসহ গোটা অভয়নগর উপজেলায় পল্লী বিদ্যুতের ভেল্কিবাজীতে মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে বন্দর এলাকার ব্যবসা-বানিজ্য ও শিল্প কলকারখানা।
বর্তমানে যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি -২ এর এ অংশটি তার ছেড়া, জ্বলে যাওয়া, ও ট্রান্সফরামার ব্লাস্ট হওয়া রোগে ভুগছে। সেই সাথে রয়েছে গ্রীডের জাম্পার আউটসহ প্রতিদিনই কিছু না কিছু সমস্যা। বেলা ১১ টা থেকে ১২ টা বা সাড়ে ১২ টার মধ্যে এ রোগের তীব্রতা বাড়তে শুরু করেছে।
মাসের পর মাস এ সমস্যা চলতে থাকলেও এ নিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কোন মাথা ব্যাথা নেই। বেশ খোঁশ মেজাজেই রয়েছেন তারা। জোড়াতালিসহ নানাবিধ অভিযোগ রয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিরুদ্ধে।
রীতিমত মাস গেলেই বিলের কাগজ ধরিয়ে দিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়াই যেন এ সংস্থার একমাত্র কাজ হয়ে দাড়িয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভৌতিক বিল তৈরি, আজীবন মিটার ভাড়া, সংস্কার বিলসহ প্রতিমাসে নানা খাতে কোটি কোটি টাকা আয় করছে সংস্থাটি। সরকারের নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহকে হুমকির মুখে ফেলে ফায়দা লুটে নিচ্ছে বলেও অভিযোগ সাধারণ মানুষের।
গত ২০২০ সালে টানা প্রায় এক বছর প্রতি শুক্রবার এ এলাকায় দিনভর বিদ্যুৎ বন্ধ রেখে সংস্কার কাজ করেছে পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগ। সে সময় যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর অভয়নগরের জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেলেন এ সংস্কার কাজ শেষ হলে আর ঘন ঘন তার ছিঁড়বেনা, জাম্পার আউট হবেনা, জ্বলে যাওয়ার আশংকাও কমে যাবে কয়েকগুণ। গ্রাহকদের নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতেই পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বড় সংস্কারের আয়োজন করেছে। সে সময় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জনগনকে ভবিষ্যতের সুবিধার জন্য সে সময়কার বিদ্যুৎ না থাকার কষ্ট সহ্য করার জন্য অনুরোধ করেন।
স্থানীয়রা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সেই অনুরোধে মুখ বুজে মাসের পর মাস বিদ্যুৎ বিহীন শুক্রবার পার করেছে। ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে পবিত্র জুম্মার নামাজ আদায় করেছে। তীব্র গরমে যখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা তখনও তারা মুখ বুজে সয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সে সময়কার অত্যাচার। তাদের প্রত্যাশা ছিলো এ সংস্কার কাজ শেষ হলেই তারা একটু স্বস্তি পাবে। অথচ সংস্কার কাজ শেষ হওয়ার পরও নূন্যতম কোন পরিবর্তন হয়নি। হাজারও কারনে ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎ বিহীন পার করতে হচ্ছে এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের।
পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের এমন চরম অব্যবস্থাপনায় রীতিমত ফুঁসে উঠতে শুরু করেছে শিল্প-বানিজ্য ও বন্দর শহর খ্যাত নওয়াপাড়ার ব্যবসা পাড়া। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একদিকে করোনার ধাক্কায় নাস্তানাবুদ ব্যবসায়ীরা। অনেকে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম। তার উপর প্রতিদনই দেড় দুই ঘন্টা বিদ্যুৎ না থাকায় রীতিমত হুমকির মুখে পড়েছে ব্যবসায়ীরা। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কম্পিউটারের কাজ করতে পারেনা। আমাদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দেখা দেয় আরও ভোগান্তি। বন্ধ থাকে ছোট-বড় মিল কলকারখানা। বন্ধ থাকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কুটির শিল্পসহ অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠান। পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের এ অবস্থা চলতে থাকলে তাদের রাস্তায় নেমে আন্দোলন করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবেনা বলেও মন্তব্য করেছেন অনেক ব্যবসায়ী।
এদিকে পল্লী বিদ্যুতের এহেন অত্যাচারে কেবল ব্যবসাযীরা নয় সর্বমহল অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। পরিশোধিত বিল বকেয়া দেখিয়ে গ্রামের অশিক্ষিত খেটে খাওয়া সহজ সরল মানুষদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায়, ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল তৈরি, নিজ মিটার আজীবন ভাড়া কর্তন, এতো কিছুর পরও প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা নানা অযুহাতে বিদ্যুৎবিহীন করে রাখা। তিনি পল্লী বিদ্যুৎকে প্রশ্ন রেখেছেন, “আর কত নিরবতা পালন করলে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গবে বলতে পারেন?”
আলাউদ্দিন খান হীরার মত নওয়াপাড়ার অনেক সচেতন ব্যক্তিই তাদের সামাজিক এ যোগযোগ মাধ্যমে সরব পল্লী বিদ্যুতের এইসব খামখেয়ালীপণা নিয়ে। প্রতিদিনই শহরে বিদ্যুতের কারনে বাসা বাড়িতে দেখা দিচ্ছে পানির সংকট, নষ্ট হচ্ছে টিভি ফ্রিজ। কিন্তু এসবে যেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কিছুই যায় আসে না। তারা জনগনকে জিম্মি করে কেবল নিজেদের প্রাপ্য কড়ায় গণ্ডায় আদায় করতেই সিদ্ধহস্ত।
এ ব্যাপারে নওয়াপাড়া সার, সিমেন্ট ও খাদ্য শষ্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব শাহ্ জালাল হোসেন বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা করলেও শিল্প বানিজ্য বন্দর নগর নওয়াপাড়ায় সেচিত্র ভিন্ন। প্রতিদিনই কোন না কোন কারন দেখিয়ে এক দেড় ঘন্টা বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হয়। ফলে নওয়াপাড়ার ব্যবসা বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, প্রতিদন সন্ধ্যার পর থেকে এ অঞ্চলে লো ভোল্টেজ দেখা দেয়। ফলে টিভি, ফ্রিজ ও এসি সঠিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় নষ্ট হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের স্থানীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বললে তারা অতিরিক্ত লোডের কারনে এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানান- যগে করেন এ ব্যবসায়ী নেতা। এ প্রসংগে তিনি পল্লী বিদ্যুতের উদ্দেশ্যে বলেন, দিন দিন মানুষের জীবন যাত্রা উন্নত হচ্ছে। ডিজিটালাইজেশন বাস্তবায়ন হওয়ার পর বিদ্যুতের ব্যবহার আরও বেড়েছে। সে অনুযায়ী বিদ্যুতের বিলও দিচ্ছে স্থানীয়রা। বিদ্যুৎ বিভাগকে অবশ্যই সে মাফিক লোডের ব্যবস্থা করতে হবে। বছরের পর বছর অতিরিক্ত লোডের কথা বলে জনগনের ভোগান্তি বাড়ানো অমানবিক।
এ ব্যাপারে যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি – ২ এর নওয়াপাড়া জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল মামুন এর সাথে কথা বললে তিনি তার কন্ঠে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে প্রশ্ন রেখে বলেন, “ কি করবো প্রতিদিনই গ্রীডে একটার পর একটা সমস্যা হচ্ছে। বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় চাপ কোলাতে হিমশিম খাচ্ছে। উপজেলা ব্যাপী বিদ্যুতের লোড বাড়ার কারনে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। অতিরিক্ত লোডের চাপ সইতে না পেরে তার ছিড়ে যাচ্ছে, গ্রীডে তার জ্বলে যাচ্ছে, বিভিন্ন পয়েন্টে সংযোগে সমস্যা দেখা দিচ্ছে, জাম্পার আউট হচ্ছে, ট্রান্সফরমার ব্লাস্ট হচ্ছে।” এ সময় তিনি দ্রুত এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন বলে জানান।
এ ব্যাপারে অভয়নগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি শাহ্ ফরিদ জাহাঙ্গীর বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছেন। কোথাও কোন লোডশেডিং নেই। জনগনের ভোগান্তির কথা মাথায় নিয়ে আমি একাধিকবার পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম এর সাথে কথা বলেছি। তিনি বরাবরই অতিরিক্ত লোডের কথা বলেন। অতিরিক্ত লোডের কথা বলে জনগনের ভোগান্তি বছরের পর বছর জিইয়ে রাখা অমানবিক। মাঝে মাঝে সংস্কার অবশ্যই দরকার। তাছাড়া হুট হাট করে বিদ্যুতের তার বা ট্রান্সমিটারে সমস্যা হতেই পারে। কিন্তু সেটা প্রতিদনের রূটিন হলে জনগন তা মানতে চাইবে না। আমি ডিজিএম সাহেবকে একাধিকবার বলেছি, সংস্কার কাজ থাকলে সকাল ৬ টা থেকে ১০ টার মধ্যে সেরে ফেলার চেষ্টা করবেন- যোগ করেন এ জনপ্রতিনিধি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বজায় রাখতে এবং দেশের চলমান উন্নয়নের ধারায় সহযোগি হিসেবে কাজ করতে সেই সাথে জনভোগান্তি লাঘবে পল্লী বিদ্যুতকে আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দেন।




No comments
please do not enter any spam link in the comment box.